বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৫:০৮
রাজ‘আত কী এবং কুরআন, সুন্নাহ ও বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে এর সংঘটনের কী কী প্রমাণ রয়েছে?

রাজ‘আত কী এবং কুরআন, সুন্নাহ ও বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে এর সংঘটনের কী কী প্রমাণ রয়েছে? মৃত্যুর পর মৃতদের পুনরায় জীবিত হওয়া কি অসম্ভব কোনো বিষয়, নাকি ইতিহাসে এর কোনো দৃষ্টান্ত রয়েছে?

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

মজিদুল ইসলাম শাহ

সংক্ষিপ্তসার:

শিয়া আকীদা অনুযায়ী, রাজ‘আত হলো হযরত ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে একদল খাঁটি মুমিন এবং একদল কঠোর শত্রুর দুনিয়ায় পুনরায় ফিরে আসা। এর প্রমাণ হিসেবে যুক্তিগত দলিল-অর্থাৎ আল্লাহর ক্ষমতার দৃষ্টিতে এর সম্ভবপরতা-এবং রেওয়ায়েতভিত্তিক দলিল-যেমন হযরত উযায়ের (আ.) ও আসহাবে কাহফের ঘটনা-এবং ইমামগণ (আ.) থেকে বর্ণিত নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত পেশ করা হয়। এই আকীদা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচারের বাস্তবায়নকে নির্দেশ করে। শিয়াদের বহু বিশিষ্ট আলেম প্রাচীনকাল থেকেই এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে আসছেন।

উত্তর:

১. রাজ‘আতের সংজ্ঞা

‘রাজ‘আত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘ফিরে আসা’। আর শিয়া কালামশাস্ত্রের পরিভাষায়, হযরত ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে একদল মুমিন এবং কিছু কাফেরের পুনরায় জীবিত হয়ে দুনিয়ায় ফিরে আসাকে রাজ‘আত বলা হয়।

এই প্রত্যাবর্তন আল্লাহর অনুমতিতে সংঘটিত হবে। এর উদ্দেশ্য হলো ইমাম যামান (আ.)-এর ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা থেকে উপকৃত হওয়া এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করা। রেওয়ায়েতসমূহ অনুযায়ী, এ সময় খাঁটি মুমিন এবং কিছু মুনাফিক ও আহলে বাইত (আ.)-এর কঠোর শত্রু পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসবে। এর ফলে মুমিনরা সত্য ও ন্যায়ের চূড়ান্ত বিজয় প্রত্যক্ষ করবে এবং শত্রুরা নিজেদের কর্মের শাস্তি ভোগ করবে।[১]

২. রাজ‘আতের যৌক্তিক সম্ভাবনা

বুদ্ধি-বিবেকের দৃষ্টিতে রাজ‘আত শুধু অসম্ভব নয় এমন নয়; বরং তা আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। যে আল্লাহ শূন্য থেকে সমগ্র জগত সৃষ্টি করেছেন এবং কিয়ামতের দিন মৃতদের জীবিত করবেন, তিনি কিয়ামতের পূর্বেও একদল মানুষকে পুনরায় জীবিত করে তুলতে সক্ষম।

মরহুম সাইয়্যিদ মুর্তাজা এ বিষয়ে বলেন: শিয়া ইমামিয়া যে বিষয়ে বিশ্বাস পোষণ করে, কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিই এতে সন্দেহ করতে পারে না যে, এটি মহান আল্লাহর ক্ষমতাধীন এবং এটিকে অসম্ভব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। [২]

অতএব, যুক্তির দৃষ্টিতে রাজ‘আত একটি সম্ভব ও সংঘটনযোগ্য বিষয়। কারণ আল্লাহ সর্ববিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।[৩]

৩. মৃতদের জীবিত হওয়ার ঐতিহাসিক ও কুরআনিক দৃষ্টান্ত

পবিত্র কুরআন মৃতদের পুনরুজ্জীবন এবং কিয়ামতের সম্ভাবনা প্রমাণ করার জন্য অতীতের এমন কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছে, যেখানে মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, অতীতেও এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

ক) মৃত্যুভয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের ঘটনা

আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারায় বলেন:

«أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ خَرَجُواْ مِن دِيَارِهِمْ وَهُمْ أُلُوفٌ حَذَرَ الْمَوْتِ فَقَالَ لَهُمُ اللَّهُ مُوتُواْ ثُمَّ أَحْيَاهُمْ»

“তুমি কি তাদের দেখনি, যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল, অথচ তারা ছিল হাজার হাজার? তখন আল্লাহ তাদের বললেন, ‘মৃত হয়ে যাও।’ অতঃপর তিনি তাদের জীবিত করলেন।”[৪]

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহ একদল মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করেছিলেন।

খ) হজরত উজায়ের (আ.)-এর ঘটনা এবং একশ বছর পর পুনরুজ্জীবন

সূরা আল-বাকারায় আল্লাহ তাআলা এমন এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যিনি একটি জনপদের ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন: আল্লাহ কীভাবে এগুলোকে মৃত্যুর পর জীবিত করবেন?

এরপর আল্লাহ তাকে একশ বছর মৃত্যুবরণ করালেন। তারপর তাকে জীবিত করলেন এবং তাকে দেখালেন কীভাবে তিনি অস্থিগুলোকে একত্রিত করেন এবং সেগুলোর ওপর গোশত আবৃত করেন।[৫]

গ) হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য পাখিদের জীবিত হওয়ার ঘটনা

হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, তিনি যেন তাঁকে দেখান কীভাবে মৃতদের জীবিত করা হয়।

আল্লাহ তাঁকে চারটি পাখি নিয়ে সেগুলো জবাই করতে এবং তাদের অংশবিশেষ বিভিন্ন পাহাড়ের ওপর রেখে দিতে নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি সেগুলোকে ডাকবেন; তখন জীবিত পাখিগুলো তাঁর কাছে ফিরে আসবে।[৬]

এই আয়াতগুলো সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করে যে, মৃতদের জীবিত হওয়া অসম্ভব কোনো বিষয় নয়; বরং এটি সংঘটিত হয়েছে এবং আল্লাহ তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য ইতিহাসে এর বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।

৪. কুরআন ও সুন্নাহতে রাজআত

ক) কুরআনিক দলিল

মরহুম তাবরাসি সূরা আন-নামলের ৮৩ নম্বর আয়াতের তাফসিরে বলেন:

«وَيَوْمَ نَحْشُرُ مِن كُلِّ أُمَّةٍ فَوْجًا مِّمَّن يُكَذِّبُ بِآيَاتِنَا»

“আর যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে এমন একটি দলকে সমবেত করব, যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত...”

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি ইমামগণ (আ.) থেকে বর্ণিত একাধিক রেওয়ায়েতের ওপর নির্ভর করে বলেন:

‘ইমামগণ (আ.) থেকে বর্ণিত বহু রেওয়ায়েত অনুযায়ী, হজরত মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব ও তাঁর কিয়ামের সময় আল্লাহ তাঁর কিছু শিয়া ও অনুসারীকে, যারা ইতিপূর্বে মৃত্যুবরণ করেছে, জীবিত করবেন; যাতে তারা তাঁকে সাহায্য করার সওয়াব অর্জন করতে পারে এবং তাঁর রাষ্ট্রে আনন্দ ও উল্লাস প্রকাশ করতে পারে।‘[৭]

খ) রেওয়ায়েতভিত্তিক দলিল

ইমামগণ (আ.) থেকে রাজ‘আত সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শাইখ মুফিদ বলেন: আল্লাহ ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব ও কিয়ামের সময় একদল মৃত মানুষকে তাদের পূর্বের আকৃতিতে জীবিত করে ফিরিয়ে আনবেন। অতঃপর তিনি একদলকে সম্মানিত করবেন এবং অন্যদলকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবেন... সমগ্র ইমামিয়া এই মতের ওপর রয়েছে, কেবল অতি অল্পসংখ্যক ব্যক্তি ব্যতিক্রম, যারা রেওয়ায়েতগুলোর ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে করেন। [৮]

এছাড়া মরহুম শাইখ সাদুক তাঁর আল-ই‘তিকাদাত গ্রন্থে বলেন: রাজ‘আত সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হলো-এটি সত্য। [৯]

এই রেওয়ায়েতগুলো শিয়া আলেমদের মধ্যে রাজ‘আত সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যের বিষয়টি তুলে ধরে।

৫. রাজআতের উদ্দেশ্য ও দর্শন

রাজ‘আত কেবল দুনিয়াবি জীবনে ফিরে আসার অর্থ বহন করে না; এর পেছনে উচ্চতর কিছু উদ্দেশ্যও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. ইমাম মাহদী (আ.)-এর ন্যায়ভিত্তিক শাসন থেকে মুমিনদের উপকৃত হওয়া:

যেসব খাঁটি মুমিন দুনিয়ায় ইমাম মাহদী (আ.)-কে সাহায্য করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন, তারা রাজ‘আতের সময় দুনিয়ায় ফিরে আসবে, যাতে তাঁর বিশ্বব্যাপী ন্যায়ের শাসনে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং সত্যের চূড়ান্ত বিজয় প্রত্যক্ষ করতে পারে।

২. শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ:

কিছু অত্যাচারী ও আহলে বাইত (আ.)-এর শত্রুকেও দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে তারা ইমাম মাহদী (আ.)-এর হাতে শাস্তি পায় এবং নিজেদের কর্মের পরিণতি ভোগ করে।

৩. আল্লাহর ক্ষমতার প্রকাশ:

রাজ‘আত মৃতদের জীবিত করার ক্ষেত্রে আল্লাহর পরম ক্ষমতার প্রকাশ। একইসঙ্গে এটি আবির্ভাবের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে মুমিনদের ঈমানকে শক্তিশালী করবে।

৬. রাজআত সম্পর্কে শিয়া আলেমদের ঐকমত্য

শাইখ সাদুকের সময় থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত শিয়াদের বহু বিশিষ্ট আলেম রাজ‘আত বিষয়ে তাঁদের গ্রন্থ ও রচনার একটি বড় অংশ উৎসর্গ করেছেন। আল্লামা আকা বুজুর্গ তেহরানি তাঁর আয-যারিয়া গ্রন্থে এ বিষয়ে রচিত বহু গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন।[১০]

উপসংহার

রাজ‘আত শিয়া মতবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুপ্রতিষ্ঠিত আকীদা, যার পক্ষে যুক্তিগত, রেওয়ায়েতভিত্তিক ও ঐতিহাসিক দলিল পেশ করা হয়। মৃতদের পুনরায় জীবিত হওয়া কোনো অসম্ভব বিষয় নয়; বরং ইতিহাসে এর বিভিন্ন দৃষ্টান্ত রয়েছে এবং পবিত্র কুরআনেও সেসবের উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ইমামগণ (আ.) থেকে বর্ণিত বহু রেওয়ায়েত হযরত ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে রাজ‘আত সংঘটিত হওয়ার কথা নির্দেশ করে। শাইখ মুফিদ, সাইয়্যিদ মুর্তাজা ও শাইখ সাদুকের মতো শিয়া মাজহাবের বিশিষ্ট আলেমগণও এ বিশ্বাসের ওপর জোর দিয়েছেন।

অতএব, রাজ‘আত শিয়া সংস্কৃতিতে একটি গভীর ও সুপ্রোথিত বিশ্বাস, যা কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে শিয়া আলেমরা মনে করেন এবং যা বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মুমিনদের আশাকে আরও শক্তিশালী করে।

তথ্যসূত্র

[১] মুরাওয়্যাজি তাবাসি, বামদাদ-এ বাশারিয়াত, পৃ. ১১৮।

[২] আশ-শিয়া ওয়ার-রাজ‘আহ, খণ্ড ২, পৃ. ২৫৮।

[৩] সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৬০।

[৪] সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৪৩।

[৫] সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৯।

[৬] সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৬০।

[৭] মাজমাউল-বায়ান, খণ্ড ৭, পৃ. ৩৬৭।

[৮] আওয়াইলুল-মাকালাত, পৃ. ৮৯।

[৯] আশ-শিয়া ওয়ার-রাজ‘আহ, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৮।

[১০] আয-যারিয়া, খণ্ড ১, পৃ. ৯০।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha